ক্যাসিনোর সম্রাট রূপগঞ্জের সেলিম প্রধান গ্রেফতার

প্রকাশিত হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার :

রাজধানীর গুলশানে একটি অভিজাত স্পা সেন্টারের মালিক তিনি। কোটি টাকার গাড়িতে অস্ত্রধারী দেহরক্ষী নিয়ে তার চলাফেরা। বিশ্বের একাধিক দেশে তার শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। অথচ স্পা ব্যবসা ছাড়া দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস নেই।

গোয়েন্দারা বলছেন, ঢাকার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক থাইল্যান্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। এসব অর্থ পাচারে সহায়তা করেন সেলিম প্রধান। এছাড়া সেলিম আন্তর্জাতিক ক্যাসিনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত।

৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ইউনিট ফ্লাইটে হাজির হলে ফ্লাইট ছাড়তে ৩টা বেজে যায়। সেখান থেকে তাকে র‌্যাবের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।

তবে তার গ্রেফতারের খবরে বহু প্রভাবশালীর ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কেননা তিনি এ সারির অনেকের বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। মূলত এমন অভিযোগেই তাকে বিদেশ যেতে দেয়া হয়নি।

সেলিম প্রধানের  বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার  মুর্তুজাবাদ দক্ষিনপাড়া হাজী হান্নান প্রধান’র ছেলে।

জানা  যায়, সেলিম প্রধান কারাবন্দি গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বিজনেস পার্টনার ছিলেন। বিএনপি শাসনামলের আলোচিত ব্যক্তির নাম গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। বিএনপি সরকারের পতন হলেও সেলিম প্রধান থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

১/১১ সরকারের সময়ে জাহিদ নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সেলিম প্রধান বেপরোয়া হয়ে উঠেন। সূত্র বলছে, সেলিম প্রধানের চলাফেরা দেখেই অনেকে হতভম্ব হয়ে যান। কারণ তার আশপাশে সবসময় স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ১০ জন দেহরক্ষী থাকেন।

রাস্তায় চলার সময় গাড়িতে উচ্চ শব্দে হুটার বাজানো হয়। ভিআইপি প্রটোকলের মতোই তার গাড়িবহরে থাকে ৫-৬টি দামি গাড়ি। বহরের মাঝখানে থাকে সেলিমের কালো টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি। সেলিম প্রধানের বিপুল অঙ্কের অর্থ রয়েছে থাইল্যান্ডে। ব্যাংককের পাতায়া বিচের কাছে তিনি ডিস্কো খোলেন ২০০৪ সালের দিকে।

আছে হোটেল ব্যবসাও। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সেলিম প্রধান একসময় থাইল্যান্ডের ডন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। থাইল্যান্ডের পাতায়া বিচঘেঁষা পাশাপাশি দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন রয়েছে। পাতায়া শহরেও প্রধান স্পা নামে একাধিক বিউটি সেন্টার রয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তদন্ত শুরু হয়। এতে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে সেলিম প্রধানের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য উঠে আসে। এরপরই মূলত কোণঠাসা হয়ে পড়েন থাই পাসপোর্টধারী সেলিম প্রধান।

সেলিম প্রধান জাপানিদের অর্থায়নে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন। বিএনপি সরকারের সময় এখান থেকে প্রায় সব ব্যাংকের চেক বইসহ ব্যাংকিং দলিলপত্র ছাপানো হতো। এই প্রিন্টিং ব্যবসার নামে তিনি একাধিক ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন।

ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতে তার সঙ্গে হাত মেলান ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। জনৈক ফরিদ নামের রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) সেলিম প্রধানের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। সেলিম প্রধানের মালিকানাধীন ‘প্রধান স্পা সেন্টারে’ অনেক প্রভাবশালীর যাতায়াতের কথা শোনা যায়।

গুলশানের ৩৩ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত এই স্পা সেন্টার ঘিরে মুখরোচক নানা কথাও আছে রাতের ধনাঢ্যপাড়ায়। সঙ্গতকারণে মাঝে মাঝেই সেখানে ভিআইপি আগন্তুকের দেখা মেলে।

এ সময় স্পা সেন্টার ঘিরে নিরাপত্তার তোড়জোড় শুরু হয়। এ সুবাদে অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে তার রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। রহস্যমানব সেলিম প্রধানের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়া এলাকায়।

সূত্র বলছে, ঋণের নামে রূপালী ব্যাংকের ১শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে অপরাধ জগতে নাম লেখান স্পা ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান। জাপানের অর্থায়নে শিল্প গড়ার নামে ঋণ নেয়া হলেও পুরো টাকাই আত্মসাৎ করা হয়। একপর্যায়ে টাকা নিয়ে দেশের বাইরে চলে যান সেলিম।

স্থায়ী আবাস গড়েন জাপানের রাজধানী টোকিওতে। কিন্তু টোকিওতেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত হন। জাপান থেকে বহিষ্কার করা হলে চলে যান আমেরিকায়। সেখানে এক আমেরিকানকে বিয়েও করেন। আমেরিকান স্ত্রীকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফের জাপানে ঢোকার চেষ্টা করেন।

কিন্তু এ যাত্রায়ও সফল হননি। সেলিম প্রধানকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তবে তাকে বেশিদিন কারাবাস করতে হয়নি। এরপর গুলশানের একটি স্পা সেন্টার ঘিরে তিনি নতুন করে নেটওয়ার্ক গোছানোর কাজ শুরু করেন।

সেলিম প্রধানের মোট ৫ জন স্ত্রী আছেন বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। এর মধ্যে একজন রাশিয়ান, একজন আমেরিকান, একজন জাপানি এবং দু’জন বাংলাদেশি। সেলিমের ছোট বউ বা ৫ নম্বর স্ত্রী সহকারী কাস্টমস কমিশনার। বর্তমানে কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সেলিম প্রধান তার স্ত্রীকে চাকরি দিতে যুবলীগের এক নেতাকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে সব ফাইনাল করেন। সেলিম প্রধানের ৩৩ নম্বর রোডের স্পা সেন্টারটি একসময় চালাতেন কয়েকজন জাপানি নাগরিক। তাদের সঙ্গে সখ্য থাকার সুবাদে তিনি জাপান যাওয়ার টিকিট পান।

কিন্তু তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করে জাপানিদের কাছ থেকে স্পা সেন্টার দখল করে নাম দেন ‘প্রধান স্পা’। যে বাড়িতে স্পা সেন্টারটি বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে, এর মালিক শাহজাহান নামের এক বিএনপি নেতা। শাহজাহানের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। দীর্ঘদিন বাড়িটি দখল রেখেছেন সেলিম প্রধান।

এখানে মন্তব্য করুন

Calendder

অক্টোবর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« সেপ্টেম্বর    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  

এখানে বিজ্ঞাপন দিন

এখানে বিজ্ঞাপন দিন